হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, “আদর্শ সমাজের দিকে” শীর্ষক মাহদাভিয়াত বিষয়ক এই ধারাবাহিক আলোচনা ইমাম যামান (আজ্জাল্লাহু তা‘আলা ফারাজাহুশ শরীফ)-সংক্রান্ত শিক্ষা ও জ্ঞান প্রচারের উদ্দেশ্যে সম্মানিত পাঠকমণ্ডলীর জন্য উপস্থাপিত হচ্ছে।
প্রতীক্ষাকারীদের দায়িত্ব সম্পর্কে বহু আলোচনা রয়েছে; তবে সংক্ষেপে বলা যায়, মানুষের দায়িত্বসমূহ দুই ভাগে বিভক্ত—
সাধারণ দায়িত্বসমূহ
এই দায়িত্বগুলো মাসূম (আ.)-গণের বাণীতে গায়বাতের যুগের করণীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; তবে বাস্তবে এগুলো কেবল এই যুগের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, বরং সব সময়ের জন্যই প্রযোজ্য। গায়েবতের যুগে এগুলোর উল্লেখ মূলত গুরুত্ব বোঝানোর জন্য।
এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে ধরা হলো—
১. নিজের যুগের ইমামকে চেনা (মা‘রিফাতুল ইমাম)
প্রত্যেক যুগে, বিশেষ করে গায়েবতের যুগে, ইসলামী শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নিজের ইমামকে সঠিকভাবে চেনা ও তাঁর মা‘রিফাত অর্জন করা।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
إِعْرِفْ إِمَامَکَ فَإِنَّکَ إِذَا عَرَفْتَ لَمْ یَضُرَّکَ تَقَدَّمَ هَذَا الْأَمْرُ أَوْ تَأَخَّرَ
তোমার ইমামকে চিনে নাও; কারণ তুমি যদি তোমার ইমামকে চিনে ফেলো, তবে এই বিষয় (আবির্ভাব) দেরি হোক বা তাড়াতাড়ি—তাতে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না।” [আল-কাফি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭১]
নিঃসন্দেহে ইমামকে চেনা আল্লাহকে চেনারই একটি অংশ; বরং এটি সেই মা‘রিফাতেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যেমন দুআয়ে মা‘রিফাতে বলা হয়েছে:
اللَّهُمَّ عَرِّفْنِی نَفْسَکَ ... اللَّهُمَّ عَرِّفْنِی حُجَّتَکَ فَإِنَّکَ إِنْ لَمْ تُعَرِّفْنِی حُجَّتَکَ ضَلَلْتُ عَنْ دِینِی
হে আল্লাহ! আমাকে তোমাকে চিনিয়ে দাও… হে আল্লাহ! আমাকে তোমার হুজ্জতকে চিনিয়ে দাও; নচেৎ আমি আমার দ্বীন থেকে পথভ্রষ্ট হয়ে যাব।”
[আল-কাফি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪২]
২. আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসায় অবিচল থাকা
প্রত্যেক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও মহব্বত বজায় রাখা। গায়বাতের যুগে ইমামের অনুপস্থিতির কারণে বিভিন্ন পরিস্থিতি মানুষকে এই দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করতে পারে—তাই রেওয়ায়াতে এ বিষয়ে দৃঢ় থাকার বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই ভালোবাসা আল্লাহরই নির্দেশ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বহু আগেই তাঁর আহলে বাইতের প্রতি গভীর মহব্বতের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। যেমন তিনি ইমাম মাহদী (আ.ফা.) সম্পর্কে বলেন:
بِأَبِی وَ أُمِّی سَمِیی وَ شَبِیهِی ...
“আমার পিতা-মাতা তাঁর জন্য কুরবান হোক! তিনি আমার নামের অধিকারী এবং আমার সদৃশ…” [কিফায়াতুল আছার, পৃষ্ঠা ১৫৬]
আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) বলেন:
فَانْظُرُوا أَهْلَ بَیتِ نَبِیکُمْ ... بِأَبِی ابْنُ خِیرَةِ الْإِمَاءِ
“তোমরা তোমাদের নবীর আহলে বাইতের প্রতি লক্ষ্য রাখো… আমার পিতা তাঁর জন্য কুরবান হোক—তিনি উত্তম কন্যাদের সন্তান।”
[বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৩৪, পৃষ্ঠা ১১৮]
ইমাম সাদিক (আ.) বলেন:
لَوْ أَدْرَکْتُهُ لَخَدَمْتُهُ أَیامَ حَیاتِی
“আমি যদি তাঁকে পেতাম, তবে আমার পুরো জীবন তাঁর সেবায় উৎসর্গ করতাম।” [বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫১, পৃষ্ঠা ১৪
ইমাম বাকির (আ.) বলেন:
لَأَبْقَیتُ نَفْسِی لِصَاحِبِ هَذَا الْأَمْر
“আমি আমার জীবনকে এই বিষয়ের অধিকারীর জন্য প্রস্তুত রাখতাম। [বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫২, পৃষ্ঠা ২৪৩]
এসব রেওয়ায়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, গায়বাতের যুগে আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা—বিশেষ করে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর প্রতি মহব্বত—একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য দায়িত্ব।
৩. ইমামদের নির্দেশনা অনুসরণ করা
যেহেতু সকল ইমাম (আ.) একই নূরের ধারক, তাই তাঁদের বক্তব্য ও নির্দেশনার উদ্দেশ্যও এক ও অভিন্ন। তাই যে কোনো ইমামের অনুসরণই মূলত সকল ইমামের অনুসরণ।
ইমাম মূসা ইবনে জাফর (আ.)-এর যুগে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেন: “আপনি কি কায়েমুল হক্ক?”
তিনি বলেন:
أَنَا الْقَائِمُ بِالْحَقِّ ... لَهُ غَیْبَةٌ ...
“আমি সত্যের কায়েম; তবে প্রকৃত কায়েম, যিনি পৃথিবীকে ন্যায়বিচারে পূর্ণ করবেন, তিনি আমার বংশের পঞ্চম ব্যক্তি… তাঁর জন্য দীর্ঘ গায়েবত থাকবে…” [কামালুদ্দীন ও তামামুন নি‘মাহ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৬১]
অতঃপর ইমাম (আ.) বলেন, “ধন্য সেই সব শিয়া, যারা আমাদের গায়েবতের যুগে আমাদের রশি দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে, আমাদের মহব্বতে অবিচল থাকবে এবং আমাদের শত্রুদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে… তারা আমাদের অন্তর্ভুক্ত এবং আমরাও তাদের অন্তর্ভুক্ত।”
অতএব, প্রতীক্ষার যুগে প্রকৃত দায়িত্ব হলো—ইমামকে চেনা, তাঁর প্রতি ভালোবাসায় অবিচল থাকা এবং তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করা।
এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…
উৎস: ‘দারসনামা-এ মাহদাভিয়াত’, খোদা-মুরাদ সোলাইমান; সামান্য সম্পাদনাসহ।
আপনার কমেন্ট